বগুড়া ও রাজশাহীতে আগাম শীতের সবজির ফলন ভালো হয়েছে। শিম, ধনিয়া পাতা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউসহ নানা সবজির দাম গত বছরের তুলনায় বেশি। কৃষকরা বলছেন, আগাম বাজারজাত করায় ভালো লাভ হচ্ছে। বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে দেশজুড়ে সবজি যাচ্ছে। রাজশাহীর কৃষকরাও আগাম সবজি চাষে লাভবান। মৌসুম শেষে উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পোকামাকড় ও রোগবালাই কম থাকায় কৃষক কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন করতে পারছেন। বগুড়ায় আগাম সবজি বাজারজাত শুরু হয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগে। শিম, ধনিয়া পাতা, ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কৃষকরা জানিয়েছেন, ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টির কিছু প্রভাব থাকলেও মৌসুম শেষে ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে।
শিবগঞ্জ উপজেলার শৌলীগ্রামের চাষি বেলাল হোসেন বলেন, ‘১৮ শতাংশ জমিতে শিম চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। দামও প্রত্যাশিত। গত বছর প্রতি কেজি শিম বিক্রি করেছি ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়, এবার বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। এ দাম থাকলে ভালো লাভ হবে।’
মহাস্থান হাটের খুচরা বিক্রেতা মো. আপেল বলেন, ‘গত বছর খুচরা বাজারে শিম বিক্রি হয়েছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। এবার দাম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। ধনিয়া পাতার কেজি এখন ৪০০ টাকা। যেটা গত বছর ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।’
বগুড়ার মহাস্থান হাট উত্তরাঞ্চলের প্রধান সবজি ও মসলা বাজার। এখান থেকে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি সবজি যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের ৩২টি জেলায়। প্রবীণ সবজি ব্যবসায়ী আইনুল হক বলেন, ‘৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। প্রতিদিন অন্তত তিনটি ট্রাকে সবজি পাঠাই। কখনো কাঁচা মরিচ, কখনো শীতের সবজি।’
সদর উপজেলার মণ্ডল ধরন গ্রামের ইউনুস আলী হাটে এনেছেন ১৪ মণ ধনিয়া পাতা। তিনি জানান, ‘দাম ভালো, কেজিতে ৪০০ টাকা। তবে ক্রেতারা এখন কম পরিমাণেই নিচ্ছেন, ২৫০ গ্রাম বা তার কম।’
দেশি টমেটো ও গাজর এখনো পুরোপুরি বাজারে উঠেনি। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আরও একমাস সময় লাগবে। আপাতত বাজারে রয়েছে ভারতীয় টমেটো (১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি) ও চীনা গাজর (৯০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি)। মুলার দাম মণপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। বেগুন কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। যেটা গত বছরের তুলনায় বেশি। পাইকারি বাজারে শসার দাম কেজি ৪০ টাকা, খুচরায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। কিন্তু সময় হাতে আছে। মৌসুম শেষে ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে বলে আশা করছি।’ তিনি জানান, গত বছর বগুড়ায় ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে শীতের সবজি চাষ করে ৪৩ হাজার ৭২৫ টন ফলন হয়েছিল। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন সাড়ে ১৬ টন। এ বছর ২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। ১ হাজার ১০০ টন উৎপাদন হয়েছে। মৌসুম চলমান থাকায় আরও বাড়বে।অন্যদিকে রাজশাহীর কৃষকরাও আগাম সবজি চাষে লাভবান। ফলে জেলায় উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে শীতের সবজি বাজারে আসে। কিন্তু বর্ষা শেষে আগাম সবজি উঠছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি। কৃষকরা প্রতি বিঘায় কয়েক গুণ লাভ পাচ্ছেন।
পবা উপজেলার পারিলা, বড়গাছী, হরিপুর, নওহাটা, দামকুড়াসহ এলাকার মাঠে সবুজের সমারোহ। কোথাও চলছে চারা রোপণ, কোথাও তোলা। পুরুষ ও নারী শ্রমিকরা একসঙ্গে কাজ করছেন।নওহাটা কাঁচা বাজারে আগাম লাউ, মুলা, লালশাক ও ফুলকপি উঠেছে। পাইকারি বাজারে লাউ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, খুচরায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হরিপুর ইউনিয়নের মশিউর রহমান বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করেছি। খরচ ৪০ হাজার টাকা। পাইকারি বাজারে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। লাভ হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।’ একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছি। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বাজারে তুলব। গত বছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছি, এবারও সেই আশা করছি।’ নওহাটা পৌর এলাকার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘৩০ শতক জমিতে আগাম কপি চাষ করেছি। আরও ২০ দিনের মধ্যে বাজারে তুলব। মৌসুম শুরুতে সবজির দাম বেশি থাকে, তাই ভালো লাভ আশা করছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে এ মৌসুমে ১৫ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্য। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৭৯ হেক্টরে আগাম সবজি চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৩০ টন উৎপাদনের লক্ষ্য ধরে মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৮০০ টন সবজি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘আগাম সবজি চাষ কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। মৌসুমের আগে বাজারে তুললে ভালো দাম পাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চারা নির্বাচন, জমি প্রস্তুতি, সার প্রয়োগ ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, করলা, শিম ও টমেটো চাষে এবার ফলন ও দাম দুই-ই ভালো।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, ‘আগাম সবজি চাষ অত্যন্ত লাভজনক। কৃষকের আয় বাড়ছে, স্থানীয় বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে। পোকামাকড় ও রোগবালাই কম থাকে, ফলে কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন সম্ভব।’

