১. নিজের সম্পর্কে একটু বলুন। আপনার উদ্যোগের নাম কী এবং কী ধরনের পণ্য/সেবা নিয়ে কাজ করছেন?
উত্তর : আমি মাহমুদা লিমা। ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি এবং ICMAB তে CMA করছি।
আমার উদ্যোগের নাম A Lot Of – ALO (আলো)। ব্যাগ, ওয়ালেট, হেয়ার অ্যাক্সেসরিজ, জুয়েলারি, স্টেশনারি, হোম ডেকোরসহ বিভিন্ন লাইফস্টাইল পণ্য নিয়ে কাজ করছি।
২. উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেয়েছেন? ব্যাবসা শুরু করার পেছনের গল্পটা কী?
উত্তর : নিজস্ব পরিচয় তৈরি করার লক্ষ্যে স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাচ্ছিলাম, সেই ইচ্ছা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু।
৩. প্রথম বিনিয়োগ কত ছিল? কী পরিমাণ মূলধন নিয়ে ব্যাবসা শুরু করেছিলেন?
উত্তর : খুব অল্প মূলধন দিয়ে শুরু করেছিলাম। প্রায় ২ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে প্রথম কিছু পণ্য সংগ্রহ করি। এরপর ধীরে ধীরে লাভের অর্থ আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছি। ক্রেতাদের ভালো সাড়া পেয়ে পুনরায় আবার ১৫০০০ টাকা বিনিয়োগ করি। তারপর থেকে ধীরে ধীরে আজকের অবস্থানে এসেছি আলহামদুলিল্লাহ।
৪. আপনার পণ্যের বিশেষত্ব কী? নতুন কোনো পণ্য বা সেবা নিয়ে কাজ করছেন কি?
উত্তর : আমার পণ্যের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো বৈচিত্র্য এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত পণ্য। সবসময় নতুন ও ট্রেন্ডিং পণ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করি, যাতে ক্রেতারা এক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের মানসম্মত পণ্য পান। এছাড়াও প্রি অর্ডারের ভিত্তিতে ক্রেতারা তাদের পছন্দের পণ্য আনিয়ে নিতে পারেন।
৫. শুরুতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
উত্তর: একদম শুরুতে একা প্রোডাক্ট সোর্সিং করাটা আমার জন্য একটু কঠিন ছিলো এবং নতুন পেইজ তেমন কোন রিভিউ ছিলো না, তখন ক্রেতার বিশ্বাস অর্জন করাটাও চ্যালেঞ্জ ছিলো।
৬. কার সমর্থন বেশি পেয়েছেন?
উত্তর: পরিবারের সবাই এখন সমর্থন করেন আলহামদুলিল্লাহ। পরিবারের পাশাপাশি সমর্থন পেয়েছি আমার বান্ধবীদের। এখনো তারা আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বিশেষভাবে শুভ্রার সাপোর্ট অনস্বীকার্য। উনাদের সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
৭. কোনো সংগঠনের সহায়তা পেয়েছেন? তাহলে তাদের সম্পর্কে একটু বলুন।
উত্তর : হ্যাঁ। ব্যবসায়ের প্রায় শুরু থেকেই আমি “খ তে খাঁটি পরিবার” সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি। আমার ব্যবসায়ের অর্গানিক প্রচারণা মুলত এই গ্রুপের মাধ্যমেই হয়েছে। বিজনেস পরিচালনার অনেক কিছু শিখেছি, এখনো শিখছি।
এই সংগঠন নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ব্যবসা প্রচার, মেলা আয়োজন এবং নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ করে দেয়। নতুন যারা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম সত্যিই অনেক উপকারী।
৮. কঠিন সময়ে নিজেকে মোটিভেটেড রাখেন কীভাবে?
উত্তর : আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি কঠিন সময়ই নতুন কিছু শেখার সুযোগ। নিজের লক্ষ্য মনে রাখি, সফল মানুষের গল্প পড়ি এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামনে এগিয়ে যাই।
৯. উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটি? একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
উত্তর: গত বছর একটি প্রোগ্রামে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সাফল্য মানে কি? সেদিন আমি কোন উত্তর দেইনি, বলেছিলাম এখনো সফল হয়নি। কিন্তু এখন বলতে পারি, আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করা। রিপিট ক্রেতার সংখ্যা কম নয়। আলহামদুলিল্লাহ।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সততা, ধৈর্য এবং শেখার আগ্রহ।
১০. এমন কোনো ব্যর্থতা আছে যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন?
উত্তর: হ্যাঁ। শুরুতে কিছু পন্য প্রত্যাশামতো বিক্রি হয়নি। তখন বুঝেছি, বাজার ও ক্রেতার চাহিদা বুঝে পরিকল্পনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই অভিজ্ঞতা আজ আমাকে আরও সচেতনভাবে ব্যাবসা পরিচালনা করতে সাহায্য করছে।
১১. কাজ ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন?
উত্তর: সময়ের সঠিক পরিকল্পনাই দুই দিক সুন্দরভাবে সামলাতে সাহায্য করে।
১২. বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাকরি না করে ব্যাবসা— কোনটা বেশি বাস্তব? আপনার কী মনে হয়?
উত্তর: আমার মতে, চাকরি ও ব্যাবসা— দুটোরই গুরুত্ব আছে। চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিমাসে নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়, যা ব্যাবসার ক্ষেত্রে হয় না।
তবে যার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, ধৈর্য এবং শেখার ইচ্ছা আছে, তার জন্য উদ্যোক্তা হওয়া একটি দারুণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। একজন উদ্যোক্তা হয়ে শুধু নিজের নয়, অন্য মানুষের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়।
১৩. ছোটোবেলায় কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?
উত্তর : ছোটোবেলায় ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিলো। মূলত আমার বাবা চাইতেন, উনার কোনো একজন সন্তান ডাক্তার হোক। বাবার চাওয়া থেকেই আমার মধ্যে সেই স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। আফসোস, বাবার সেই ইচ্ছে পুরন করতে পারিনি।
১৪. আপনার ব্যাবসার সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা কী? এমন কোনো গ্রাহকের গল্প আছে যা আজও মনে পড়ে?
উত্তর : একজন গ্রাহক আমার কাছ থেকে পণ্য কিনে এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, পরে তিনি তার পরিবারের আরও কয়েকজনকে আমার নিয়মিত ক্রেতা বানিয়েছেন।
আরেকটি মজার ঘটনা আছে, একদম শুরুর দিকের কথা।
আমার ভাগ্নে-ভাতিজি, ভাতিজারা সবাই ছোট ছোট। তাদের মধ্যে রাইয়ান একটু বড়,তার একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। যখন সে প্রথম জানতে পারলো, তার ফুপ্পি বিজনেস করে, তখন সে নিজের পছন্দে একটি পেনসিল বক্স কিনলো । এরপর তার বাবা-মাকে কিছু না বলেই দৌড়ে গিয়ে নিজের জমানো টাকা থেকে সেই পেনসিল বক্সের মূল্য পরিশোধ করলো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অতিরিক্ত টাকা ফেরত নিতে চাইছিল না সে, বলছিল, “এটা ফুপ্পিকে দিবো”।
আমার নিস, নেফিউ সহ এই ছোট্ট ক্রেতাদের ভালোবাসা, তাদের খুশি —এসব সত্যিই আমাকে অনেক আনন্দ দেয়।
১৫. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আগামী ৫ বছরে আপনার ব্যবসাকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর: আগামী পাঁচ বছরে আমি A Lot Of – ALO-কে একটি পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। ভবিষ্যতে নিজস্ব শোরুম ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী আরও বেশি মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে চাই।
১৬. যারা এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য আপনার বার্তা/পরামর্শ কী?
উত্তর: আমি নিজেও এখনো শিখছি তারপরও বলবো ছোট থেকে শুরু করুন, কিন্তু স্বপ্ন বড় রাখুন। শুরুতেই বড় লাভের চিন্তা না করে শেখার দিকে গুরুত্ব দিন। সততা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমই একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় মূলধন। কখনো হাল ছেড়ে দেবেন না। সফলতা একদিন অবশ্যই আসবে।

