পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনআরবি ব্যাংক পিএলসি আয়কর আইন অমান্য করায় শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় ব্যাংকটিকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরে এনআরবি ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো নগদ বা শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি পুরো মুনাফাই রিটেইন আর্নিংসে স্থানান্তর করবে। বিদ্যমান আয়কর বিধান অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে বা মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি সংরক্ষণ করলে সংরক্ষিত ওই অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো নিয়মিতভাবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়।
এনআরবি ব্যাংকের ২০২৫ সালে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ২০ পয়সা। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। কিন্তু এই মুনাফা থেকে কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় পুরো অর্থই রিটেইন আর্নিংসে যোগ হবে।
এর ফলে ব্যাংকটিকে অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কর দিতে হতে পারে বলে জানা গেছে।
তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যেই ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এনআরবি ব্যাংক। তবে দুই বছর না পেরোতেই ব্যাংকটি পুঁজিবাজারের সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে গেছে। ২০২৪ সালেও প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্তির পর থেকেই ব্যাংকটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে থাকে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯ শতাংশের বেশি
ব্যাংকটির ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৫৭ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশের বেশি। ব্যাংক খাতে সাধারণভাবে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশ অতিক্রম করলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া বিদায়ী বছরে ব্যাংকটির নিট সুদজনিত লোকসান হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট পরিচালন আয় কমেছে ২৩ শতাংশ।
২০২৪ সালে ব্যাংকটির মোট পরিচালন আয় ছিল ৪১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে প্রায় ৯৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
তদন্তের দাবি বিনিয়োগকারীদের
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, এনআরবি ব্যাংকের মতো দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা ঠিক হয়নি। তাদের ভাষ্য, তালিকাভুক্তির আগে অনেক প্রতিষ্ঠান আয় ও মুনাফার চিত্র বাড়িয়ে উপস্থাপন করে, কিন্তু পরে প্রকৃত অবস্থা সামনে আসে।
তারা ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা, সুশাসন ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ অবস্থার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ব্যাংকটির জনসংযোগ কর্মকর্তা সালাউদ্দিন আহমেদ মুরাদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, “নিউজ করেন।”
এ বিষয়ে ব্যাংকের ডেপুটি কোম্পানি সেক্রেটারি মো. অনিক হাসান বিপুর সঙ্গে ফোন ও খুদে বার্তায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “এনআরবি ব্যাংক আমাদের তদারকির আওতায় রয়েছে। তাদের খেলাপি ঋণসহ সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, এনআরবি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৬৯০ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের মালিকানা ৫৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪০ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ।

