পান উৎপাদনের জন্য দেশের মধ্যে মাদারীপুর বরাবরই প্রসিদ্ধ। এখানকার উর্বর জমি ও অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদিত পান সারা দেশে সুস্বাদু হিসেবে খ্যাত। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের বৈষম্যে কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ভালো ফলন সত্ত্বেও পানের দাম পড়ে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ বছর মাদারীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ৩৫৮ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কালকিনি ও শিবচর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি জমিতে পান চাষ হয়। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এখানকার মাটির গুণগত মান ও আবহাওয়া পান চাষের জন্য আদর্শ। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কৃষকরা বলছেন, প্রতি বিঘা জমিতে পান চাষে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। জমি ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, কীটনাশক, সার ও সেচের খরচ মিলিয়ে এই ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। অথচ বাজারে পানের দাম এখন চরম নিম্নমুখী। গত বছর প্রতি বিড়া (৮০টি পান) বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এ বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।কালকিনির পানচাষি মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ২ বিঘা জমিতে পান চাষ করেছি। এতে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ গেছে। ফলন খুব ভালো হলেও ৪০ থেকে ৫০ টাকায় এক বিড়া পান বিক্রি করছি। এতে অর্ধেক খরচও উঠবে না। গত দুই বছর ধরেই এ অবস্থা। এভাবে চললে আমাদের পান চাষ ছেড়ে দিতে হবে।’
শিবচরের পান ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর ধরে পানের ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান। উৎপাদন ভালো হলেও দাম পড়ে গেছে। সরকার যদি পান রপ্তানির ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারতাম। আমাদের এলাকার পান খুব সুস্বাদু। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের দিকে একটু তাকান, না হলে আমরা সত্যিই শেষ হয়ে যাব।’
অন্যদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদারীপুরের পান স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিযোগ্য মানসম্পন্ন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বন্ধ থাকায় এ পণ্যটি এখন কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ। ফলে বাড়তি উৎপাদনের পর বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে, যা দাম কমার অন্যতম কারণ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ফরহাদুল মিরাজ বলেন, ‘মাদারীপুর পান চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া খুব উপযোগী। কিন্তু রপ্তানি ও বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সরকার যদি রপ্তানি পুনরায় চালু করে, তাহলে এই সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মত, সরকার যদি পানের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য নীতিগত সহায়তা দেয়, তাহলে মাদারীপুরের পান চাষ আবারও লাভজনক হতে পারে। বর্তমানে অনেক কৃষক লোকসান ঠেকাতে বিকল্প পেশার চিন্তা করছেন। কেউ কেউ জমি ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এখনই যদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে দেশের ঐতিহ্যবাহী পান শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

