যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত বরের মৃত্যু হয়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন হেলিকপ্টারটির পাইলটও; আর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি নতুন কনে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
নিহত বরের নাম ডেভ ফিজি (২৫)। তিনি আটলান্টার বাসিন্দা এবং ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একজন পাইলট ছিলেন। শুক্রবার ডসন কাউন্টির ডসনভিলের কাছে পাঁচ আসনের একটি ‘রবিনসন’ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ডেভ এবং ওই হেলিকপ্টারের পাইলট মারা যান। ডেভের স্ত্রী জেসনিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে কাছের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন।
ওই দিনই ডসনভিলের কাছে ‘দ্য রিভিয়ার’ নামের একটি ভেন্যুতে ডেভ ও জেসনির বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের মতে, কয়েক শ অতিথি ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।
ডেভের বাবা-মা জর্জ এবং ফেবা ফিজি বহু বছর আগে ভারতের কেরালা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান। জেসনির পরিবারের শিকড়ও কেরালার আলাপুঝা জেলায়।
আটলান্টা নিউজ ফার্স্টকে ডেভের বাবা জর্জ ফিজি বলেন, ‘ও খুব আদরের সন্তান ছিল। ও ছিল আমাদের জন্য ঈশ্বরের এক উপহার…খুব সুদর্শন ছিল ও।’
তিনি বলেন, ‘সব দিক থেকেই এটা ছিল একটা দারুণ বিয়ে। এর চেয়ে বেশি আমাদের আর কিছু চাওয়ার ছিল না।’
নবদম্পতির বিয়ের আসর থেকে হেলিকপ্টারে করে ডিকাব-পিচট্রি বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। এরপর আটলান্টার একটি হোটেলে তাদের রাত কাটানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে।
জর্জ ফিজি জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হয়। তখন কুয়াশা ও বৃষ্টির কারণে সামনের কিছুই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। একজন অভিজ্ঞ বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে ডেভ এমন আবহাওয়ায় হেলিকপ্টারে চড়তে দ্বিধা বোধ করছিলেন।
ছেলের কথা স্মরণ করে বাবা বলেন, ‘সে বলেছিল, এমন ভিজিবিলিটিতে আমি ফ্লাই করতাম না, আমরা এ অবস্থায় উড়ব না।’
এই উদ্বেগের পরও পাইলট বেশি উচ্চতায় ওড়ার কথা জানিয়ে হেলিকপ্টারটি নিয়ে রওনা হন। পরে ডসনভিলের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি দুর্গম, ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়।
জর্জ ফিজি জানান, জেসনি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ ও ভেঙে পড়া গাছের নিচে আটকে ছিলেন। এরপর উদ্ধারকর্মীরা তার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
তিনি বলেন, ‘জেসনি জানিয়েছে, যখন তার জ্ঞান ফেরে, তখন সে ধ্বংসস্তূপের নিচে ছিল। জ্ঞান ফেরার পর সে দেখতে পায় ডেভ তার বুকের ওপর পড়ে আছে। জেসনি পেশায় একজন নার্স। সে যখন ডেভকে ছুঁয়ে ডাকে, ততক্ষণে ডেভ মারা গিয়েছে।’
জর্জ ফিজি জানান, জেসনির শরীরে অনেক জায়গায় কেটে গেছে ও কালশিটে পড়েছে, তবে কোনো হাড় ভাঙেনি। কিন্তু ডেভকে হারিয়ে সে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
ডব্লিউএএলবি নিউজের খবর অনুযায়ী, ডসন কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে তারা একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পায়। পরে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিশ্চিত করে যে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ডসনভিলের কাছে তিন আরোহী নিয়ে একটি রবিনসন আর৬৬ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি বসবাসকারী এক বাসিন্দা আটলান্টা নিউজ ফার্স্টকে জানান, দুর্গম এলাকার কারণে উদ্ধারকর্মীদের চরম বেগ পেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকা যাত্রীকে উদ্ধার করতে তাদের প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছে।’ তিনি আরও জানান, ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীদের অফ-রোড গাড়ি ব্যবহার করতে হয়েছে এবং ঘন জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করতে হয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত হেলিকপ্টারটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ‘প্রেস্টিজ হেলিকপ্টারস’-এর অপারেশন ডিরেক্টর অ্যান্ডি হুইটেকার বলেন, কোম্পানির ইতিহাসে এমন দুর্ঘটনা এই প্রথম। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট পাইলটও ওই রুটের বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড এই দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তারা একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

