১. নিজের সম্পর্কে একটু বলুন।
উত্তর : আমার নাম কাজী নওশীণ লায়লা। আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আমার দেশের বাড়ি পাবনায় এবং শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ায়।
২. আপনার উদ্দোগের নাম কী এবং কী ধরনের পণ্য/সেবা নিয়ে কাজ করছেন?
উত্তর : আমার উদ্যোগের নাম খ তে খাঁটি। শুরুতে শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত ও বিশুদ্ধ খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করছি। যেমন—বিভিন্ন ধরনের বাদাম, ঘি, মধু, মসলা, সরিষার তেল, ওটস, চিয়া সিড, ফ্রোজেন টিফিন, খেজুরের গুড়, আখের গুড়, কুমড়ো বড়ি, রাজশাহীর আমসহ আরও অনেক পণ্য।
৩. উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন? কবে থেকে আপনার উদ্দোগের যাত্রা শুরু ?
উত্তর : বাবার পরিবারের অনেকেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাই ছোটবেলা থেকেই ব্যবসায়িক পরিবেশ দেখেই বড় হয়েছি।
২০২০ সালের জুন মাসে করোনা মহামারির সময় আমি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলাম। তখন পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, ছোট শিশুর দায়িত্ব, কোভিড পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে খুব কঠিন সময় পার করছিলাম। মেয়ের জন্য স্বাস্থ্যকর রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট খাবার তৈরি করতে গিয়েই ব্যবসার ধারণা আসে। প্রথমে আমার এক স্কুলবন্ধু ও এক ডাক্তার আত্মীয় আমার কাছ থেকে খাবার নিতে শুরু করেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করি। এভাবেই আমার উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা।
৪. প্রথম বিনিয়োগ কত ছিল? কি পরিমাণ মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন?
উত্তর : মাত্র ১০ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। প্রথম পোস্ট দেওয়ার পরই আমার একজন সাবেক সহকর্মী আমাকে উৎসাহ দিতে ১০ কেজি ঘি অর্ডার করেন। সেই বিক্রির টাকা দিয়েই আবার নতুন পণ্য কিনে ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাই।
৫. আপনার পণ্যের বিশেষত্ব কী?
উত্তর : আমার মূল লক্ষ্য সবসময় বিশুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা এবং মানের সঙ্গে কোনো আপস না করা।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য আমি নিজস্বভাবে তৈরি করেছি—
বেবি খিচুড়ি মিক্স,
আয়রন সুজি,
বাদাম সুজি,
ফ্রুটি ওটস,
পোহা মিক্স,
স্বাস্থ্যকর সেরেলাক,
আমার নিজের সন্তান, তাদের বন্ধু এবং আমার শিক্ষার্থীরাও এই খাবার খায়। তাই প্রতিটি পণ্য শতভাগ নিশ্চিন্ত হয়েই সংগ্রহ ও প্রস্তুত করি।
৬. শুরুতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
উত্তর : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকেই বলতেন, “ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে খাবার বিক্রি করছো?” বাবাও শুরুতে আপত্তি করতেন। তিনি মনে করতেন ব্যবসা করলে নাতনির যত্নে ঘাটতি হবে। আত্মীয়-স্বজনও অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করতেন। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেছি। এখন বাবাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ববোধ করেন।
৭. কার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন?
উত্তর : আমার মা, ছেলে এবং কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু সবসময় সাহস যুগিয়েছেন। স্বামী শুরুতে খুব বেশি যুক্ত না থাকলেও কখনও বাধা দেননি। পরে তিনিও পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।
৮. কোনো সংগঠনের সহায়তা পেয়েছেন?
উত্তর : হ্যাঁ। এসএমইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও সেমিনারে অংশ নিয়েছি।
এছাড়া আমি নিজেও “খ তে খাঁটি পরিবার” নামে একটি উদ্যোক্তা কমিউনিটি পরিচালনা করি, যেখানে প্রায় ২৬ হাজার সদস্য রয়েছেন।
এখানে নিয়মিত ব্যবসা প্রশিক্ষণ, পণ্যের ফটোগ্রাফি, ক্যানভা, বিজনেস স্যুট, অনলাইন মেলা ও অফলাইন ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। শুধু গত রমজানের অনলাইন মেলাতেই সদস্যরা আমার নিজের বিক্রির বাইরে ২০ লক্ষ টাকারও বেশি বিক্রি করেছেন।
৯. কঠিন সময়ে নিজেকে কীভাবে মোটিভেটেড রাখেন?
উত্তর : আমি বিশ্বাস করি—কাজই সবচেয়ে বড় মোটিভেশন। সমস্যা নিয়ে না ভেবে কাজ করে যাই। সন্তুষ্ট ক্রেতাদের ভালোবাসা এবং আল্লাহর ওপর ভরসাই আমাকে এগিয়ে যেতে শক্তি দেয়।
১০. উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটি? একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
উত্তর : আমার উদ্যোগ নিয়ে বিটিভি সহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে আমন্ত্রণ পাওয়া আমার অন্যতম বড় অর্জন।
সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— সততা, মানসম্পন্ন পণ্য এবং গ্রাহকের আস্থা।
১১. এমন কোনো ব্যর্থতা আছে যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন?
উত্তর : ২০২০ সালে খোলা পার্সোনাল আইডিটি হ্যাক হয়ে যায় ২০২৪ সালে। এটি আমার জন্য বড় ধাক্কা ছিল। তবে এতে আমি শিখেছি—কখনও একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বিকল্প ব্যবস্থা সবসময় রাখতে হয়।
১২. এমন কোনো ঘটনা আছে যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?
উত্তর : যখন দেখলাম আমার তৈরি শিশুদের খাবার দেশের বাইরে সুইজারল্যান্ড ও লন্ডনে থাকা মায়েরাও নিয়মিত নিচ্ছেন, তখন বুঝেছি মানুষ আমার ওপর বিশ্বাস রাখেন। এই বিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
১৩. পরিবার ও ব্যবসার ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন?
উত্তর : আমার সহকারী আছেন। ঘরের কাজ এবং ব্যবসার কাজ আলাদা করে ভাগ করা আছে।
এছাড়া আমার বড় ছেলে প্যাকিং, ওজন করা, মেমো তৈরি ও পার্সেল হস্তান্তরসহ অনেক কাজে সাহায্য করে।
১৪. বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাকরি না করে ব্যবসা, কোনটা বেশি বাস্তব? আপনার কি মনে হয়?
উত্তর : আমার মতে, দুটোরই গুরুত্ব আছে। তবে যাদের ধৈর্য, সততা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা আছে, তারা ব্যবসার মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি অন্য মানুষেরও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।
১৫. ছোটবেলায় কী হওয়ার স্বপ্ন ছিল?
উত্তর : ছোটবেলায় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তবে দাদার ইচ্ছায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি।
১৬. আপনার ব্যবসার সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা কী? এমন কোনো গ্রাহকের গল্প আছে যা আজও মনে পড়ে?
উত্তর : আমার অনেক রিপিট কাস্টমার আছেন, যারা বছরের পর বছর একই আস্থা নিয়ে পণ্য নেন।
বিদেশে থাকা অনেক গ্রাহক দেশে এলেই কুমড়ো বড়ি ও অন্যান্য পণ্য নিয়ে যান। এটি আমার কাছে খুব আনন্দের।
১৭. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? আগামী ৫ বছরে আপনার ব্যবসাকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর : আমার স্বপ্ন নিজের একটি ডেলিভারি এজেন্সি তৈরি করা, যাতে শুধু আমার নয়, “খ তে খাঁটি পরিবার”-এর নারী উদ্যোক্তারাও সহজে ও নিরাপদে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারেন।
১৮. যারা উদ্দোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য আপনার বার্তা / পরামর্শ কী?
উত্তর : কাজ, কাজ এবং কাজ।
এর সঙ্গে মানসম্পন্ন পণ্য, সততা এবং ভালো ব্যবহার যোগ করুন। তাহলে ইনশাআল্লাহ, আপনার সফলতা কেউ আটকে রাখতে পারবে না।
সহযোগিতায় : @খ তে খাঁটি পরিবার

