মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন দুঃখ-কষ্টে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই নেতিবাচকতা নিঃশব্দে আত্মার ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে তাকে ক্ষয় করতে থাকে। তাই আমাদের মনে রাখা উচিত ‘অন্ধকারকে অভিশাপ দেওয়ার চেয়ে একটি মোমবাতি জ্বালানোই শ্রেয়।’
কারণ কেউ যদি সকাল-সন্ধ্যা শুধু অন্ধকারকেই দোষারোপ করে, তবু অন্ধকার দূর হবে না। তাই নিজের মধ্যে আশা ও আলোর প্রদীপ জ্বালানো, নিজের পথকে আলোকিত করা এবং অন্যদেরও সাধ্য অনুযায়ী ভালো কাজে উৎসাহিত করা জরুরি। এ জন্য করণীয় হলো—
প্রথমত : কর্মে উৎকর্ষ সাধন করা। ইতিবাচকতার পথে আমাদের প্রথম পদক্ষেপই হওয়া উচিত কর্মে উৎকর্ষ সাধন করা। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কর্ম দেখবেন, তাঁর রাসুল এবং মুমিনরাও দেখবেন। আর অচিরেই তোমাদের সেই সত্তার কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছুর জ্ঞান রাখেন। অতঃপর তিনি তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৫)
এই আয়াত আমাদের কর্মমুখর, দায়িত্বশীল ও সচেতন জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের উচিত নিজ নিজ মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া এবং প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদন করা। আর আল্লাহ মানুষের অন্তরের গোপন বিষয়ও অবগত—আমাদের উদ্দেশ্য সত্যিই তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য—সবই তাঁর কাছে স্পষ্ট।
দ্বিতীয়ত : জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কর্মে অবিচল থাকা। ইসলাম মানুষের জীবনে কর্ম প্রচেষ্টাকে একটি ধারাবাহিক ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত, এমনকি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা সাময়িক নয়; বরং পুরো জীবনজুড়েই তা অব্যাহত থাকে। তাই তো মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হতে শুরু করে এবং তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে সে যেন সুযোগ থাকলে তা রোপণ করে ফেলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৯)
এই হাদিস আমাদের সামনে এক গভীর তাৎপর্য উন্মোচন করে। একটি গাছ বড় হতে এবং ফল দিতে দীর্ঘ সময় লাগে—এটি সবাই জানে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এমন এক মুহূর্তে, যখন পৃথিবীর সমাপ্তি আসন্ন, তখন কেন একটি গাছ লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হলো, যার ফল হয়তো রোপণকারী নিজেই কখনো ভোগ করতে পারবে না? এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, এখানে ‘কিয়ামত’ বলতে তার চূড়ান্ত মুহূর্ত নয়; বরং তার পূর্বলক্ষণ বা সূচনাকাল বোঝানো হয়েছে। এই সময়ে এখনো কিছুটা সুযোগ থাকে, যাতে অন্য কেউ সেই গাছের ফল থেকে উপকৃত হতে পারে। উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে এই শিক্ষা দেওয়া যে কোনো অবস্থায়ই যেন সে সৎকর্ম থেকে বিরত না হয়; এমনকি যদি তা জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তও হয়।
তৃতীয়ত : আপনি কী রোপণ করছেন? আত্মজিজ্ঞাসা। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের কাছে প্রশ্ন রাখা উচিত আমি জীবনে কী বপন করছি, যার ফল আমি দুনিয়া ও আখিরাতে উপভোগ করতে চাই? আমি কি এমন কোনো বীজ বপন করছি, যা আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে? নাকি আমি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি সুন্দর ও সহানুভূতিশীল কথা শিখছি? আমি কি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এমন উপদেশ দিচ্ছি, যা একজন বা একাধিক মানুষের উপকারে আসে এবং যার সুফল ধীরে ধীরে আরো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে? আমি কি কখনো কোনো অপরিচিত মানুষকে সান্ত্বনা দিই? তাকে তার অচেনা পথ চিনিয়ে দিই? অথবা জীবিকা, আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অর্জনের উপায় শেখাতে সাহায্য করি? আমি কি আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিই? প্রতিনিয়ত এই প্রশ্নগুলো আমাদের নিজেদের করা উচিত।
চতুর্থত : কর্মের মূল্য ও অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহার। অনেক মানুষই দীর্ঘ কর্মজীবনের পর অবসর গ্রহণ করেন, তাঁদের সঙ্গে থাকে অমূল্য অভিজ্ঞতা ও গভীর জ্ঞান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁদের অনেকেই এই সম্পদ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন। বাস্তবতা হলো অবসর গ্রহণ একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় ধাপ, যা নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। তবে একজন মানুষের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কখনো শেষ হয় না। এটি একদিকে যেমন ধর্মীয় দায়িত্ব, তেমনি মানবিক প্রয়োজনও বটে। কাজের মধ্যেই মানুষ নিজের মূল্য উপলব্ধি করে, অনুভব করে—তার জীবনের এখনো অর্থ আছে, সে এখনো সমাজে অবদান রাখতে পারে।
পঞ্চমত : যেকোনো কাজ মর্যাদা বা পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে। একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, তার জন্য কর্মে নিয়োজিত থাকা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ, ‘একবার এক ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে একটি দোয়াত হাতে দেখে বললেন, হে আবু আবদুল্লাহ! আপনি তো এত উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছেন, মুসলমানদের ইমাম হয়েছেন। এভাবে আর কত দিন পরিশ্রম করে যাবেন? জবাবে তিনি বলেন, মৃত্যু পর্যন্ত।’ (মানাকিবুল ইমাম আহমাদ)
তাই জ্ঞান অর্জন এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কখনো থেমে থাকা উচিত নয়; বরং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ একজন মুসলমান তার প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
ষষ্ঠত : দুর্বল ও তরুণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম আমাদের শেখায়; পরিস্থিতি যেমনই হোক, প্রত্যেক মানুষের কাছ থেকেই কিছু না কিছু অবদান প্রত্যাশা করা হয়। যেমন—মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ এই উম্মতকে বিজয় দান করেন তাদের দুর্বলদের মাধ্যমেই—তাদের দোয়া, প্রার্থনা ও আন্তরিকতার কারণে।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৩১৭৮)
বাহ্যিকভাবে দুর্বল মনে হলেও তাদের অন্তরের শক্তি অসীম। তাদের দোয়া, খাঁটি আন্তরিকতা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা সমাজে বরকত বয়ে আনে। এই আন্তরিক হৃদয়গুলোই আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাদের অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞা, যা আল্লাহর নৈকট্য থেকে উৎসারিত, সমাজে কল্যাণ ও প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। এভাবে আমাদের পরিবারের ছোট ছোট সদস্যও ইতিবাচকতা ছড়ানোর ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সরল হাসি, নিষ্পাপ আনন্দ ও প্রাণবন্ত আচরণ একটি ক্লান্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনকে মুহূর্তেই প্রশান্ত করে দিতে পারে।
সপ্তমত : কোনো কাজ তুচ্ছ মনে না করা। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো সৎকর্মই ছোট নয়। একটি কাজ যতই ক্ষুদ্র মনে হোক না কেন, আন্তরিক নিয়ত সেটিকে মহিমান্বিত করে তোলে এবং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তাই মহানবী (সা.) আমাদের উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো সৎকর্মকে তুচ্ছ মনে কোরো না, যদিও তা হয় তোমার ভাইকে হাসিমুখে অভিবাদন জানানো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২৬)
এ কারণে কোনো ভালো কাজকে অবহেলা করা উচিত নয়। যে কাজটি আমাদের কাছে তেমন গুরুত্বহীন মনে হতে পারে, সেটিই হয়তো আল্লাহর কাছে আমাদের মুক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষের নেক আমলের পাল্লা এই ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই ভারী হয়। আর এই পাল্লার ওজনের ওপরই নির্ভর করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ। তাই তো অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করো, যদিও তা অর্ধেক খেজুর দানের মাধ্যমেই হোক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৪০)
কারণ ছোট ছোট সৎকর্ম একত্র হয়ে একসময় বিশাল সওয়াবে পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭)
অষ্টমত : সচেতনতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরি। কোনো কাজ করার আগে সচেতনতা ও দূরদর্শিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অজ্ঞতা বা অসতর্কতা অনেক সময় ভালো কাজকেও ব্যর্থ করে দিতে পারে। একটি কাজকে সফল ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। বিভিন্ন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মানুষ যখন একত্র হয়ে কাজ করে, তখন সেই কাজের পরিধি ও প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর ভালো কাজ যেন সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ না থাকে, বরং তা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

