ইফ্ফাত বেনীন পিয়াল। রাজশাহীর মেয়ে। বিয়ের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই মনে জেগেছিল স্বপ্ন—নিজের হাতে কিছু গড়ে তোলার।
ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে শেখা সুই–সুতার কাজই ছিল তাঁর প্রথম হাতিয়ার। ২০০৬ সালে শুরু করেন অ্যাপ্লিক কাজ—শাড়ি, থ্রি-পিস, বেডশিট, কুশন কভার বানাতেন। টুকটাক বিক্রিও হতো। সেই থেকেই শুরু তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা।
সংসার, সন্তান, তারপরও হার না মানা এক নারী
বিয়ের কিছু বছর পর দুই সন্তানের মা হন পিয়াল—এক ছেলে, এক মেয়ে। সংসারের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের বুটিকের কাজ আর চালিয়ে যেতে পারেননি।
তখনও ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যবসা বা ফেসবুক পেজের মতো সুযোগ ছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। সময় গড়িয়েছে, সন্তানরা বড় হয়েছে—জীবন আবারও নতুন মোড় নিয়েছে।
২০২২ সালে পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দেয়।
“সেই দশটা দিন আমাকে জীবনের অনেক কিছু শিখিয়েছে,” বলেন পিয়াল।
তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং সিদ্ধান্ত নেন—নিজেকে আবার নতুনভাবে গড়ে তুলবেন।
সোনার গহনা বিক্রি করে ব্যবসার শুরু
নিজের কোনো পুঁজি ছিল না। তাই তিনি নিজের কিছু গহনা বিক্রি করে শুরু করেন দেশীয় জুয়েলারি, শাড়ি ও থ্রি-পিসের অনলাইন ব্যবসা—
এভাবেই জন্ম নেয় তাঁর উদ্যোগ ‘Pial Fashion Studio’।
শুরুটা ছিল কঠিন। নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে কেউ চিনত না তাঁকে। কিন্তু পাশে ছিলেন তাঁর মা।
“মা বলতেন, হাল ছাড়বি না। আজ না হোক কাল হবে।”
মায়ের কথাই সত্যি হয়। পিয়াল নিজে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী—সবাইকে জানান দিতে থাকেন তাঁর পণ্যের কথা। ধীরে ধীরে সেল বাড়ে, ক্রেতারা পেজে রিভিউ দিতে শুরু করেন।
এক বছরের মাথায় বাসায় স্টক রাখার জায়গা না থাকায় বাসার নিচেই একটি শোরুম খুলে ফেলেন।
‘জয়িতা’ হয়ে নতুন অনুপ্রেরণা
শোরুমের কাজের পাশাপাশি তিনি নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রকল্প ‘জয়িতা’ সম্পর্কে জানতে পারেন। বুঝতে পারেন, নিজের হাতে তৈরি পণ্যের বিকল্প নেই।
২০২৪ সালে গহনার কোর্স এবং ২০২৫ সালে পাট পণ্য তৈরির কোর্সে ভর্তি হন।
কোর্স চলাকালীনই তাঁর তৈরি পাটের গহনা ও ঝুড়ির অর্ডার আসে ফেসবুকে, আবার মেলার স্টল থেকে বিক্রিও হয়।
“কোর্স শেষ হওয়ার আগেই অর্ডার পাওয়া ছিল আমার জন্য বড় অনুপ্রেরণা,” বলেন পিয়াল।
দিনের শুরু ভোরে, শেষ গভীর রাতে
একজন মা, গৃহিণী এবং উদ্যোক্তা—সব ভূমিকাতেই সমান পারদর্শী পিয়াল।
ভোরে রান্না, সন্তানদের স্কুলে দেওয়া, তারপর শোরুমে যাওয়া—এরপর দিনভর ব্যস্ততা। দুপুরে কুরিয়ারে পণ্য পাঠানো, বিকেলে অনলাইন পোস্ট, রাতে ডিজাইন তৈরি ও প্যাকেজিং।
“কখনো মনে হয় ২৪ ঘণ্টা দিনটা আমার জন্য যথেষ্ট না,” হাসতে হাসতে বলেন তিনি।
‘সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়’
এখন তাঁর স্বামীও পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহযোগিতা করছেন ব্যবসা এগিয়ে নিতে।
“সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়,” বলেন পিয়াল, “আমি আজ জানি—যে মানুষ হাল ছাড়ে না, তার জন্য অসম্ভব কিছু নেই।”
ইফ্ফাত বেনীন পিয়ালের ‘Pial Fashion Studio’ আজ শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং নারীর আত্মবিশ্বাস, সাহস আর পরিশ্রমের প্রতীক।
নিজ হাতে গড়া সাফল্যের গল্প দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—
“ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়” শুধু প্রবাদ নয়, বরং জীবনের বাস্তবতা।

