পত্রিকার পাতা
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. উদ্যোক্তা
  5. কর্পোরেট
  6. কৃষি ও প্রকৃতি
  7. ক্যাম্পাস-ক্যারিয়ার
  8. খেলাধুলা
  9. চাকরির খবর
  10. জাতীয়
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. তারুণ্য
  13. ধর্ম
  14. পর্যটন
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সব খবর

শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষক-শিক্ষার্থীবান্ধব না হলে শিক্ষা সংস্কার অধরাই থেকে যাবে

কবির হোসাইন
জুলাই ১৫, ২০২৬ ৬:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একটি রাষ্ট্রকে বদলে দিতে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি শিক্ষা। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প কিংবা প্রশাসনের উন্নয়ন— সবকিছুর ভিত্তি একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থা যদি বারবার নীতিগত অস্থিরতা, সমন্বয়হীনতা এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের শিকার হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রজন্ম, আর তার প্রভাব বহন করতে হয় পুরো জাতিকে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও আমরা এখনো এমন একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি, যা একই সঙ্গে মানসম্মত, কর্মমুখী, গবেষণাভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা নীতির অগ্রাধিকার বদলায়, পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হয়, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে রদবদল আসে, কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যায়।

এই বাস্তবতায় নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা।

নেতৃত্বের প্রথম শর্ত—শোনার মানসিকতা

শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাস বলছে, অনেক সংকটের মূল কারণ সিদ্ধান্ত নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া বড় নীতিগত পরিবর্তন আনলে বাস্তবায়নের সময় নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

একজন সফল শিক্ষামন্ত্রী সেই ব্যক্তি, যিনি মনে করেন না যে সব উত্তর তাঁর কাছেই আছে। তিনি প্রশ্ন শোনেন, সমালোচনা গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সাহস রাখেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় এই অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের সংস্কৃতি যত শক্তিশালী হবে, নীতির গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে।

শিক্ষক: কেবল বাস্তবায়নকারী নন, নীতির অংশীদার

বাংলাদেশের লাখো শিক্ষক প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা কোনো দপ্তরের ফাইল পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। তাই শিক্ষককে কেবল নির্দেশ পালনকারী কর্মকর্তা হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁকে শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ, ন্যায্য পদোন্নতি, সময়োপযোগী বেতন-কাঠামো এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমানো—এসব বিষয়কে শিক্ষা সংস্কারের মূল আলোচনায় আনতে হবে। একজন সম্মানিত শিক্ষকই একজন আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে পারেন।

শিক্ষার্থী কি সত্যিই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে?

আমরা প্রায়ই বলি—’শিক্ষার্থীই শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু’। কিন্তু বাস্তবে তাদের অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ, শেখার পরিবেশ, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কিংবা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়নের সংস্কৃতি এখনও দুর্বল।

শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার নম্বর অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তবে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি সংস্কারে শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

কেন একটি স্বাধীন শিক্ষা সংস্কার কমিশন?

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা কমিশন হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক সংস্কারের জন্য একটি স্থায়ী, স্বাধীন এবং বহুমাত্রিক জাতীয় শিক্ষা সংস্কার কমিশন এখন সময়ের দাবি।

এই কমিশন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দিতে পারে। এতে শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষা প্রশাসক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সংস্কারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং নাগরিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়।

দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা পরিমাপের উপযোগী করতে হবে।

তৃতীয়ত, সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে না করে।

চতুর্থত, শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় দাপ্তরিক জটিলতা কমিয়ে শিক্ষককে পাঠদানে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পঞ্চমত, ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য দূর করা জরুরি। প্রযুক্তির সুযোগ সবার জন্য সমান না হলে ডিজিটাল শিক্ষা প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।

নীতির ধারাবাহিকতা জরুরি

শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ফলাফল পেতে সময় লাগে। তাই ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান—সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।

শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন

শিক্ষা কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় বিনিয়োগ। তাই বড় শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, শিক্ষক সমাজ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে যত বেশি ঐকমত্য তৈরি হবে, তত বেশি স্থায়িত্ব আসবে।

নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সামনে সুযোগ

নতুন শিক্ষামন্ত্রী চাইলে প্রশাসনিক নির্দেশের পরিবর্তে সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তিনি চাইলে শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন, গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং স্বাধীন শিক্ষা সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেন।

এই ধরনের উদ্যোগ শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার মানই বাড়াবে না, বরং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করবে।

উপসংহার

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যে শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের কথা শোনে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা টিকে থাকে; আর যে ব্যবস্থা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তা বারবার সংকটে পড়ে। শিক্ষা খাতে স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক সংস্কার।

তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষামন্ত্রী, যিনি সংলাপকে শক্তি হিসেবে দেখবেন এবং একটি স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কারের পথে এগিয়ে নেবেন।

কারণ শিক্ষা কোনো সরকারের নয়—শিক্ষা পুরো জাতির। আর সেই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অহংকার নয়, প্রয়োজন প্রজ্ঞা; একক সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন অংশগ্রহণ; সাময়িক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী শিক্ষা সংস্কার।

লেখক: কবির হোসাইন
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
পিরোজপুর দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।