শুধু জিপিএ নয়, শেখার মান চাই
একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় পড়ে তার মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় লিখতে বলা হলে সে থেমে যায়। নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বীজগণিতের সূত্র মুখস্থ বলতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ শতকরা হিসাব করতে গিয়ে ভুল করে। একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে ভালো নম্বর পেলেও পাঁচ মিনিট স্বাভাবিকভাবে ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দিতে পারে না।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন শিক্ষাক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো— বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কি প্রকৃত শিক্ষায় রূপান্তরিত হচ্ছে?
বিশ্বব্যাপী শিক্ষাবিদরা বর্তমানে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন, সেটি হলো Learning Crisis— অর্থাৎ শেখার সংকট। এই সংকটের অর্থ হলো : শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, সনদ পাচ্ছে; কিন্তু শ্রেণি-উপযোগী জ্ঞান, ভাষা, গণিত ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
এই উদ্বেগ কেবল ধারণাভিত্তিক নয়, আন্তর্জাতিক গবেষণাও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৭–১৪ বছর বয়সি শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠ দক্ষতা এবং মাত্র ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণিত দক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি দুইজন শিশুর একজনও বয়স-উপযোগীভাবে পড়তে পারে না এবং দশজনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি মৌলিক গণিত দক্ষতায় পিছিয়ে। এই তথ্য শুধু শিক্ষার নয়, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতারও একটি সতর্ক সংকেত।
বিশ্বব্যাংক বহুবছর ধরে Learning Poverty ধারণাটি ব্যবহার করছে। এর অর্থ— ১০ বছর বয়সী একটি শিশু যদি একটি সহজ গল্প পড়ে বুঝতে না পারে, তবে সে “শেখার দারিদ্র্য”-এর মধ্যে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই সমস্যা শুধু নিম্ন আয়ের দেশেই নয়; মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উন্নয়নের পথেও বড় বাধা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য ভিত্তিগত শিক্ষা (Foundational Learning) শক্তিশালী করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ইউনেস্কোও একই বার্তা দিচ্ছে। তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে পরবর্তী সব শিক্ষাই দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। শিক্ষার্থীরা তখন উচ্চশ্রেণিতে উঠলেও শেখার ঘাটতি বহন করে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিসংখ্যানও আশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক—দুই চিত্রই তুলে ধরে। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যালয়ে ভর্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, নারী শিক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ঝরে পড়া, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার বৈষম্য এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার মানের পার্থক্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর “কতজন স্কুলে যাচ্ছে।” নয়, বরং “স্কুলে গিয়ে তারা কী শিখছে?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি বাস্তবতা সামনে আসে।
প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষানির্ভর। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার চেয়ে পরীক্ষার নম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে মুখস্থবিদ্যা উৎসাহিত হয়, কিন্তু বিশ্লেষণী চিন্তা, যুক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয় না।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক চাপ, বড়ো শ্রেণিকক্ষ, সীমিত শিক্ষাসামগ্রী এবং বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে শেখানোর চ্যালেঞ্জ মানসম্মত পাঠদানকে কঠিন করে তুলছে।
তৃতীয়ত, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রযুক্তি যেমন জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মনোযোগ, পাঠাভ্যাস ও গভীর চিন্তার ক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
চতুর্থত, পরিবারেও একটা ভুল ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত— ভালো ফলাফল মানেই ভালো শিক্ষা। অথচ বাস্তবতা বলছে, ভালো ফলাফল অর্জনকারী অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেও মৌলিক ভাষা, গণিত, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
এ কারণেই আজ বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। অবকাঠামো নির্মাণ, ভর্তি বৃদ্ধি কিংবা পরীক্ষার ফলের সাফল্য— এসব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলোই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হলো : এমন নাগরিক গড়ে তোলা, যারা চিন্তা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে এবং নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারে।
কবির হোসাইন
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
পিরোজপুর দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা।

