“অর্থই অনর্থের মূল”—চিরাচরিত এই প্রবাদবাক্যের নতুন আলোচনায় উঠে এসেছে প্রখ্যাত চিকিৎসক জুনায়েদ শফিক-এর নাম। দেশের স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকারী এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
তবে উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।
প্রফেসর ডা. জুনায়েদ শফিক ১৯৭৬ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল
জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড
জাপান-বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
এনআরবি গ্লোবাল ফাইন্যান্স লিমিটেড (চেয়ারম্যান)
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো বর্তমানে তদন্তাধীন।
২ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, ঋণ বিতরণে নিয়ম লঙ্ঘন, আর্থিক অসঙ্গতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটেছে।
২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরের একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গৃহীত হয়। মামলাটি বিশেষ মামলা নম্বর ৪০/২৫ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলাটি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এবং দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় দায়ের করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অর্থপাচারের অভিযোগ
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২৩(১)(গ) ধারার ক্ষমতাবলে ডা. জুনায়েদ শফিক, তার স্ত্রী মাসুমা পারভীন এবং কন্যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থপাচারে পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত দুই কন্যার কাছেও অর্থ লেনদেনের সূত্র পাওয়া গেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন, বিনিয়োগ নথি এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করছেন।
তদন্ত সূত্রে আরও জানা যায়, নিজের প্রভাব ব্যবহার করে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পিছিয়ে দেয় নাই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছে
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে আর্থিক লেনদেন
নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে পদায়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান
অভিযোগ
রয়েছে, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন এর মধ্যে ৩টি মামলা সক্রিয়, ২টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আরও ২৬টি মামলা ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে।
তবে এসব তথ্যের সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
তথ্যসূত্রে জানা যায়, তিনি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ -কে মামাতো ভাই এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানকে খালাতো ভাই পরিচয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভাগিয়ে নিতেন
এছাড়া, তার নাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে।
বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তবে দেশে ফিরে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টার বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
প্রফেসর ডা. জুনায়েদ শফিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো দেশের স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে মামলাটি এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াধীন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হওয়া জরুরি। আইনের শাসন এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মামলাটির অগ্রগতি এখন জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

