স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনমুখী করতে একাধিক বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ, সর্বজনীন ডিজিটাল হেলথ কার্ড, নতুন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
সরকারের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণ এবং কমিউনিটিভিত্তিক সেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র
সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ড পর্যায়ে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র থেকে মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি সহায়তা, টিকাদান এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হবে। এতে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ নারী হবেন।
এ ছাড়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
চালু হচ্ছে ডিজিটাল হেলথ কার্ড
স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে সব নাগরিককে ডিজিটাল হেলথ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে একজন রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, প্রেসক্রিপশন ও রোগ নির্ণয়ের তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সহজ হবে এবং চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে।
চিকিৎসা শিক্ষায় আসছে আধুনিকায়ন
সরকার চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এমবিবিএস শিক্ষাক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রশিক্ষণ যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।
এ ছাড়া মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ঋণ এবং উচ্চশিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও আবাসন সুবিধা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমতে পারে চিকিৎসা ব্যয়
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের ব্যয় কমাতে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট, ডায়ালাইসিস ফিল্টারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর থেকে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে হার্টের স্টেন্টের দাম এবং ডায়ালাইসিসের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে, যা রোগীদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে।
পাঁচ বিভাগে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
রাজধানীর বাইরে শিশুস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ এগিয়ে চলছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব হাসপাতালে আইসিইউ, আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা এবং উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকবে।
এর ফলে শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী চাপ কমবে এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন প্রত্যাশা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কার এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারও আশা করছে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থান বা আর্থিক সক্ষমতা নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

