সুমাইয়া সুমি
পেজ: Homemade Bakery
আমি ফেনী থেকে কাজ করছি। মূলত কেক, পেস্ট্রি, কুকিস এবং ফ্রোজেন আইটেম নিয়ে আমি কাজ করি।
১) আমি ২০২৪ সালে আমার উদ্যোক্তার লাইফ শুরু করি। এর আগে আমি একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। আমি টঙ্গী গভমেন্ট কলেজ থেকে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স কমপ্লিট করি। প্রথমদিকে আমার ইচ্ছে ছিল আমি শিক্ষক হব। এবং আমি সেটাই করেছিলাম। অনেক বাচ্চাদের ভালোবাসা পেয়েছি এবং আমি আমার ওই প্রফেশন নিয়েই হ্যাপি ছিলাম। হঠাৎ করে আমি বেবি কনসিভ করি। শারীরিক জটিলতার কারণে আমাকে স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে দিতে হয়। পরবর্তীতে আমি যে টিউশনগুলো করাতাম, সেগুলো একে একে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার বেবির যখন তিন মাস বয়স, বাসায় বসে থেকে আমার মনে হল, এখন আমার কিছু করা দরকার। প্রথমদিকে অনেক জায়গায় চাকরি খুঁজেছি, কিন্তু বেবি ছোট হওয়ায় সুবিধা করে কোনো চাকরি আমি করতে পারিনি। তখন আমার মনে হল, আমি বিজনেস করবো। আমি সুন্দর ছবি এবং মেহেদী আর্ট করতে পারি। প্রথমদিকে ভেবেছিলাম এগুলো নিয়ে কাজ করব। কিন্তু পরবর্তীতে মনে হল, এগুলো খুব ধৈর্যের কাজ এবং সময়সাপেক্ষ, যা এখন এই মুহূর্তে আমার বেবি নিয়ে করা সম্ভব নয়। আমি যেহেতু টুকিটাকি রান্নাবান্না করতে পারি, তাই ভাবলাম কাজ করব। এভাবেই আমার বেকিং লাইফের শুরু।
২) আমার সিদ্ধান্তের পর আমি আমার হাজব্যান্ডকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলাম। আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেকিং শিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম বাধাই আসে আমার হাজব্যান্ডের কাছ থেকে। উনি প্রথমেই না করে বলেন, শিখতে হবে না। কেক বিক্রি করবে, মানুষ কী বলবে? আমার বন্ধুরা কী বলবে? ওইদিন প্রথম মনে হয়েছিল, উদ্যোক্তা জীবন এতটা সহজ নয়। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। আমার জমানো ৩০০০ টাকা দিয়ে আমি শুরু করেছিলাম। এবং আমি ইউটিউব থেকে সকল ধরনের বেসিক শিক্ষা নিয়েছিলাম।
৩) আমি যেহেতু কাজ করি খাবার নিয়ে, তাই সর্বপ্রথম আমি খেয়াল রেখেছিলাম স্বাস্থ্য এবং খাবারের টেস্টের উপর। আমার মনে হয়েছিল, কোনো বিজনেসকে দাঁড় করিয়ে রাখতে হলে নতুন কাস্টমারের চাইতে রিটার্ন কাস্টমার খুব প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায় যখন রিটার্ন কাস্টমার হয়ে যাবে, তখন নিউ কাস্টমার আগের কাস্টমার সাজেস্ট করে নিয়ে আসবে। তাই আমি আমার ব্যবসাকে ধরে রাখার জন্য সব সময় আমার রেগুলার কাস্টমারকে প্রায়োরিটি দিই।
৪) একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সর্বপ্রথম আমার জন্য যেটা চ্যালেঞ্জ ছিল, সেটা হলো আর্থিক। আমাকে মানসিকভাবে কেউ সাপোর্ট না করলেও আমি নিজেই নিজেকে মানসিকভাবে সাপোর্ট করতে পারি। আমি মূলত কারো কথায় আমার পরিচালনা করি না অথবা আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি না। তাই মানুষের কথা আমার উপর মানসিক কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।
৫) আমি যেদিন প্রথম অর্ডার পাই, সেদিন আমি খুবই খুশি ছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি অর্ডার পেয়েছি। এবং আমি সারাদিন পরিকল্পনা করেছি, কীভাবে অর্ডারটা সুন্দরভাবে দেওয়া যায়। অর্ডারটা ডেলিভারি দেওয়ার পর যতক্ষণ পর্যন্ত কাস্টমারের রিভিউ না পেয়েছি, আমি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমার হাত-পা কাঁপছিল। আমি কোনো কাজ করতে পারছিলাম না। ওইদিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।
৬) আমি যেহেতু ফেনী জেলা থেকে কাজ করি, ফেনীর মানুষ ভোজনরসিক। আমি সর্বপ্রথম পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাদ—এই দুটোর উপর বেশি প্রায়োরিটি দিই। আমার খাবারের স্বাদই আমাকে পরিচিত করে তুলেছে।
৭) আমি ব্যবসার শুরুর ক্ষেত্রে মার্কেটিংয়ে প্রচুর পরিমাণে ভুল করেছি। এখন যারা নতুন উদ্যোক্তা আছেন, তাদেরকে আমি বলব, ব্যবসার প্রচার এবং প্রসার মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে হয়। এবং সেই মার্কেটিং যখন সস্তা হয়ে যায়, তখন সেটা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তাই আমি তাদেরকে বলবো, মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেকে সব সময় স্মার্টভাবে প্রেজেন্ট করতে হবে।
৮) আমার যেহেতু কোনো হেল্পিং হ্যান্ড নেই এবং দুইটা বাচ্চা আছে, তাই সব কাজ আমাকে একাই সামলাতে হয়। এর পাশাপাশি আমাকে আমার ব্যবসাও সামলাতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে অনেক পরিশ্রম এবং ধৈর্যের ব্যাপার। আমি নিজেকে সেইভাবেই গড়ে তুলেছি। প্রথমদিকে অনেক কষ্ট হতো, কান্না করতাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি প্রতিটা কাজে রুটিন মেনটেইন করি। কোনটার পর কোনটা করব, কোন অর্ডারের কাজ কখন কমপ্লিট করে রাখবো, বাসার কাজ কোনটা করব, আগে কোনটা, পরে কোনটা, কোন কাজটা আমার এখন প্রয়োজন, কোনটা আরও ২ ঘণ্টা পরে করলেও চলবে—সবকিছু রুটিন করে তারপর আমি কাজ করি। এতে করে আমার কাজও সহজ হয়ে যায় এবং আমার জন্য সুবিধা হয়।
৯) প্রথমদিকে আমার হাজব্যান্ড আমাকে বারণ করেছিল। কিন্তু এখন আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং পরিশ্রম দেখে, কাজের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে, আমার হাজব্যান্ড আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করে।
১০) ডিজিটাল মার্কেটিং এবং দ্রুত পরিচিতির একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমার বিজনেসের ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, প্রথম থেকেই যখন শুরু করবে, তখন থেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে তোমার একটি পেজ তৈরি করবে। বিভিন্ন গ্রুপ, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে পরিচিতিও যেমন হবে, মার্কেটিংও যেমন হবে, তোমার ব্যবসাও এগিয়ে যাবে।
১১) তাই সময় মনে হয়েছে, আমি আর পারব না। সংসার এবং ব্যবসা দুটো সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছি বহুবার। অনেক কান্না করেছি। কিন্তু থেমে যাইনি, আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমি নিজেই নিজেকে সাহস দিই। কারণ আমি মনে করি, আত্মবিশ্বাস থাকার খুব দরকার। আমি নিজেই নিজের প্রতি কনফিডেন্স হারিয়ে ফেললে, অন্যরা আমাকে ভরসা কীভাবে করবে?
১২) ২০২৪ সালে আমি যাত্রা শুরু করেছিলাম। বেকিং সম্পর্কে আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না। নিজের আত্মবিশ্বাসে শুরু করা। ছোট্ট একজন বেকার, তারপর পার্সোনাল ট্রেনার, ধীরে ধীরে লাইসেন্স, সরকারি নিবন্ধন এবং এখন আমি একজন পিকেএফের আন্ডারে দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছি। আমার নিজের পরিবার থেকে অনেক বাধার সম্মুখীন আমি হয়েছি। সমাজের মানুষ আমাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করলেও, আমার পরিবারের মানুষ আমাকে নানান কথা বলে ছোট করেছে। সত্যি কথা বলতে, এখন এই মুহূর্তে আমি আমার হাজব্যান্ডকে ছাড়া পরিবারের আর কাউকেই তেমনভাবে পাশে পাই না।
১৩) আমার স্বপ্ন, আমার প্রতিষ্ঠান Homemade Bakery একদিন সবার মুখে মুখে থাকবে, সবার ভালোবাসা পাবে। এবং আমি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে নিয়ে কাজ করতে চাই। আমার প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া নারীরাই তাদের গল্প লিখবে এবং এগিয়ে যাবে। তারাও বাঁচবে মাথা উঁচু করে।
১৪) যারা ঘরে বসে কাজ করে, তাদেরকে বলব নিজের প্রতিভা তুলে ধর। প্রতিটা মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত। এবং কোনো কাজই ছোট না। মানুষ ছোট থেকেই আস্তে আস্তে শুরু করে। আজ যারা তোমাদেরকে কটু কথা বলবে, তুমি যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন তারাই তোমাকে সালাম দিবে।
১৫) একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, সাফল্য মানে নিজের পরিচয় তৈরি করা। চার দেয়ালের মাঝে থেকে নিজেকে আবদ্ধ করে না রেখে নিজের প্রতিভাকে তুলে ধরতে হবে। যখন কেউ পরিচিতি লাভ করবে, স্বাধীনতা এবং আর্থিক সাফল্য তার কাছে এমনিতেই ধরা দেবে।

