স্মার্টফোন এখন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। তবে প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যখন এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা এক ধরনের আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। যুক্তরাজ্যে এমন উদ্বেগজনক প্রবণতা নিয়ে কাজ করছেন থেরাপিস্টরা। ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে অনেক মানুষ এখন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সহায়তা নিচ্ছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে লন্ডনের বাসিন্দা মারিওস জানান, কোনো কোনো দিন তিনি ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ফোনের পর্দায় কাটান। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রাম তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বর্তমানে ফোন ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে তিনি ১২ সেশনের একটি থেরাপি কোর্সে অংশ নিচ্ছেন।
মারিওসের ভাষায়, ‘ফোন যেন নিজের সঙ্গে একজন মাদক বিক্রেতাকে বহন করার মতো। এটি সবসময় পকেটে থাকে, আলো জ্বালায়, শব্দ করে এবং আমাকে আবার ব্যবহার করতে প্রলুব্ধ করে।’
‘ফোন আসক্তি’ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো রোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়। তবে গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। ডেলয়েটের এক জরিপে ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় ফোন ব্যবহার করেন।
যুক্তরাজ্যের আসক্তি নিরাময় প্রতিষ্ঠান ইউকেএটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তাদের কাছে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে আসা প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের ফোন আসক্তির সমস্যাও ছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল প্রতি ১০ জনে একজন।
মার্সিসাইডের রেইনফোর্ড হল পুনর্বাসন কেন্দ্রে কর্মরত প্রধান থেরাপিস্ট কেলি ওয়াটসন বলেন, ফোন-আসক্তি যে কারও হতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বার্তা, ‘লাইক’ বা নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এতে আনন্দদায়ক অনুভূতি তৈরি হয়, যা মানুষকে বারবার ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত করে। একপর্যায়ে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
৪৮ বছর বয়সী জেমসও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। চাকরি হারানোর পর তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ ওয়েবসাইটে সময় কাটাতেন। এমনকি রাতে ঘুম ভেঙে গেলেও নিজের পোস্টে কতটি মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা দেখতেন। তিনি বলেন, ‘মনে হতো ডিজিটাল দুনিয়া আমাকে জিম্মি করে রেখেছে।’
এ ধরনের সমস্যায় ভোগা মানুষের সহায়তার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। ‘ইন্টারনেট অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যাডিক্টস অ্যানোনিমাস’ (আইটিএএ) নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রযুক্তি-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে সদস্যদের সহায়তা করছে।
এই সংগঠনের জেনি নামের এক সদস্য জানান, একসময় তিনি এতটাই আসক্ত ছিলেন যে দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে শুধু অনলাইনে ভিডিও দেখতেন। পরে পরিবারের সহায়তায় তিনি ডিভাইস থেকে দূরে থাকার চেষ্টা শুরু করেন। বর্তমানে পাঁচ বছর ধরে তিনি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের পেছনে প্রায়ই একাকিত্ব, উদ্বেগ বা মানসিক চাপের মতো বিষয় কাজ করে। তাই শুধু ফোন সরিয়ে রাখাই সমাধান নয়; এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি।
তাঁদের পরামর্শ, অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে নিজের ফোন ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, বই পড়া, শরীরচর্চা করা কিংবা বাইরে সময় কাটানোর মতো বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে।
মারিওসও বিশ্বাস করেন, ধীরে ধীরে হলেও এই আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। প্রতিদিন তিনি ফোন কম ব্যবহারের লক্ষ্য ঠিক করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আবার জীবনের ছোট ছোট বিষয় উপভোগ করতে শুরু করেছি। চেষ্টা করলে পরিবর্তন আনা সম্ভব।’


