হার্ট অ্যাটাক দিন-রাত যেকোনো সময় হতে পারে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সময়ে এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম), হরমোনের পরিবর্তন, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা—এসব কারণে সকালে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
হার্ট অ্যাটাক ঘটে যখন হৃদ্পেশিতে রক্ত সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে করোনারি ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে এমনটি হয়। এতে হৃদ্পেশি পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
শরীরের জৈবঘড়ির প্রভাব
মানুষের শরীর ২৪ ঘণ্টার একটি স্বাভাবিক ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম অনুসরণ করে। এই ছন্দ ঘুম, হরমোন নিঃসরণ, শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। এ সময় অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। ফলে হৃদ্স্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তচাপ বাড়ে এবং হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কাজ করতে হয়।
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সকালে রক্তচাপ বেড়ে যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ হলো ঘুম থেকে ওঠার পর রক্তচাপের স্বাভাবিক বৃদ্ধি।
ঘুমের সময় রক্তচাপ তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এই পরিবর্তনের ফলে রক্তনালি ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
যদি কোনো ধমনিতে আগে থেকেই চর্বি বা প্লাক জমে থাকে, তাহলে এই বাড়তি চাপের কারণে তা ফেটে যেতে পারে। এরপর সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সকালে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সকালে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা কিছুটা বেশি থাকে। একই সময়ে শরীরের জমাট বাঁধা রক্ত ভেঙে ফেলার সক্ষমতাও তুলনামূলক কম থাকে।
ফলে সংকুচিত বা ক্ষতিগ্রস্ত ধমনিতে সহজেই রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই জমাট রক্ত হৃদ্যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দিলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
দিনের শুরুতেই হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ
সকালের ব্যস্ততাও হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। ঘুম থেকে উঠে দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া, সিঁড়ি ভাঙা, কর্মস্থলে যাওয়ার তাড়াহুড়া কিংবা মানসিক চাপ—এসব কারণে হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ আরও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে যাদের হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই চাপ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
* নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
* ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
* প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
* সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ অতিরিক্ত পরিশ্রম না করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজে অভ্যস্ত হন।
* বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব বা হাত–চোয়ালে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

