চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এর নাম পুনর্বহাল করা হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কয়েক বছর পর কমপ্লেক্সটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ রাখা হয়েছিল। গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এর নাম আবার ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ করা হয়েছে।
২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি জোট সরকারের আমলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কয়েক বছর পর এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ রাখা হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৬ জুন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনকালে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি তখন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সময়ে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ করা হয়েছিল, যা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আবার এর নাম ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ করা হবে।’
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমপ্লেক্সটির নাম ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ পুনর্নির্ধারণ করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম জেলার ঐতিহাসিক কালুরঘাটস্থ ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’টি (চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ উপজেলাধীন চাঁনগাঁও মৌজার জেএল নম্বর-০৯, বিএস খতিয়ান নম্বর-০৩, দাগ নম্বর-১১৮৩৮, জমির পরিমাণ-১৬ দশমিক ৩৭ একর) এখন থেকে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নামে অভিহিত হবে।’
এর আগে গত ২৪ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র এবং শহীদ জিয়ার স্মৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
নাম পুনর্বহালে বিএনপির চিঠি
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ এরশাদ উল্লাহ আজ বাসসকে বলেন, ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সের নাম পুনর্বহালের জন্য আমরা মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। তার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তন করেছে। এই জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই, মন্ত্রী মহোদয় এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিধন্য কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের পাশে পরিত্যক্ত জায়গায় তৎকালীন বিএনপির সরকার এই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছিল। এখানে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সব স্থাপনার রেপ্লিকা করা হয়েছিল, চট্টগ্রামের মানুষের জন্য এটি একটি চমৎকার বিনোদন কেন্দ্রও। কিন্তু গত বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলার যে ষড়যন্ত্র করেছিল, সেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে এটির নাম বদলে স্বাধীনতার কমপ্লেক্স রেখেছিল।’
এরশাদ উল্লাহ আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই এটিকে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ হিসেবে চিনে-জানে। বিগত সরকার নাম পরিবর্তন করলেও স্থানীয় মানুষজন কখনোই ওই নামে এটিকে চিনেনি। তারা জিয়া কমপ্লেক্স নামেই এটিকে অভিহিত করে আসছে সব সময়।’
২০২৪ সালের পর থেকে বন্ধ পার্ক
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন পর্যন্ত পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনা করছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সংসদ সদস্যের ভাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। সরকার পতনের পর ওই দিন রাতে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ পার্কে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। এরপর থেকে পার্কটি আর খুলে দেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রামে ‘মিনি বাংলাদেশ’
চট্টগ্রাম মহানগরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১৬ দশমিক ৩৭ একর পরিত্যক্ত জায়গায় ২০০৬ সালে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কমপ্লেক্সটি ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
দেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো এক নজরে দেখার সুযোগ করে দিতে কমপ্লেক্সটিতে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লা, কান্তজিউ মন্দির, বড় কুঠি, ছোট সোনা মসজিদ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার উল্লেখযোগ্য।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মরণে এখানে একটি রিভলভিং বা ঘূর্ণায়মান টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। টাওয়ারটির ওপর রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট। এর উচ্চতা ৭১ মিটার এবং ব্যাস ৫২ মিটার।
বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এই পার্কে একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেতেন দর্শনার্থীরা। এ কারণে এটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কয়েক দফা ইজারা
পার্কটি নির্মাণের চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত এটি পরিচালনা করে কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট গ্রুপ। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কমপ্লেক্সটি পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
২০১৫ সালের এপ্রিলে ইজারার মেয়াদ শেষ হলে চসিক নতুন করে ইজারা নিতে আগ্রহ দেখায়নি। পরে একই বছরের নভেম্বরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমপ্লেক্সটির ইজারা নেয়। তখন পার্কে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৫০ টাকা।
সর্বশেষ ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালক ছিলেন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইজারার চুক্তি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।


